রাজধানীতে পানির জন্য হাহাকার

Post Iamge

Advertise

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির তীব্র সংকট বিরাজ করছে। এছাড়া সরবরাহ করা পানিতে রয়েছে ময়লা ও উৎকট দুর্গন্ধ। গ্রীষ্মের দাবদাহের কারণে পানির চাহিদা বাড়লেও পানি সরবরাহ অনেকাংশে কমেছে।

অনেক এলাকায় রান্না, ধোয়ামোছাসহ জরুরি কাজও ঠিকঠাকভাবে হচ্ছে না। নগরবাসী জীবন বাঁচানোর তাগিদে প্রতিদিন বিপুল অর্থ খরচ করে বাইরে থেকে পানি কিনে খাচ্ছেন।

নগরজুড়ে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চললেও দুর্ভোগ লাঘবে ঢাকা ওয়াসার কার্যকর কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এ কারণে ফুঁসে উঠেছেন নগরবাসী। কয়েকদিন ধরে নগরের বিভিন্ন স্থানে পানির জন্য বিক্ষোভ হচ্ছে।

শুক্রবার সকাল থেকে মিরপুরবাসী সেকশন ১১-এর পানির পাম্পের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। খবর পেয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহিরুল ইসলাম মানিক এলাকার গণ্যমান্যদের নিয়ে সমস্যা মোকাবেলায় আলোচনায় বসেন।

সভায় আপাতত পানি সমস্যা সামাধানে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দিনের বিভিন্ন সময়ে পানি সরবরাহ করা হবে। এর আগে বৃহস্পতিবার পাম্পের এক কর্মীকে লঞ্ছিত করেন স্থানীয়রা।

বৃহস্পতিবার পানির দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন রামপুরার বাসিন্দারা। গত কয়েকদিন ধরে রামপুরা ও হাতিরঝিলসংলগ্ন এলাকায় পানি নেই। এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তারা দুপুর আড়াইটা থেকে বিকাল প্রায় ৪টা পর্যন্ত সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন।

এতে করে রামপুরা-বাড্ডা ও প্রগতি সরণিতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।এলাকাবাসী জানান, গত দু’দিন ধরে রামপুরা ও হাতিরঝিলসংলগ্ন এলাকায় পানির জন্য হাহাকার চলছে। পানি সাপ্লাই দেয়া হবে বলা হলেও পানি আর আসছে না। বাধ্য হয়ে তারা সড়ক অবরোধ করেছেন।

এক বিক্ষোভকারী বলেন, পানির বিল তো কোনো মাসে বকেয়া রাখে না ওয়াসা। আবার কোথাও কোথাও পানির জন্য প্রিপেইড মিটার বসানোর কথা বলা হচ্ছে। বিল নেবেন নিয়মিত, পানি দেবেন না- তাতো মেনে নেয়া যায় না।

আন্দোলনে অংশ নেয়া গৃহবধূ শেফালী বেগম বলেন, এমনিতেই গরম, তার ওপর পানি নেই। পানি কিনে গোসল করা, খাওয়া, রান্না কি খুব সহজ কথা! দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না ওয়াসা। তাই আমরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক পূর্ব বিভাগের রামপুরা জোনের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, এলাকাবাসী আধা ঘণ্টার মতো রাস্তা অবরোধ করেছিলেন। রোজাদার, পথচারী, যাত্রীদের ভোগান্তি হচ্ছে বলে অনুরোধ করে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (টেকনিক্যাল) একেএম সহিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, রামপুরা-মধুবাগ এলাকায় পানির সমস্যা নিয়ে এলাকাবাসী আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। কিন্তু, শুনলাম তারা পানির জন্য সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন, যা দুঃখজনক। ওই এলাকার পানির সমস্যার সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, পানি সংকটে মহানগরীর শ্যামপুর, মাতুয়াইল, ডেমরা, পূর্ব রাজাবাজার, রায়ের বাজার, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, মধুবাগ, বাড্ডা, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। ভুক্তভোগীরা ঢাকা ওয়াসার কাছে লিখিত, মৌখিক এবং অনলাইনে অভিযোগ দিয়েছেন। স্থানীয় কাউন্সিলর, এমপি ও মেয়রদের কাছেও অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু প্রতিকার মিলছে না। বরং তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার বোর্ড চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. হাবিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘গ্রীষ্মের মৌসুম হওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় পানি পেতে সমস্যা হচ্ছে বলে খবর পাচ্ছি। অনেকে বলছেন, পানিতে দুর্গন্ধ রয়েছে। ওয়াসার সক্ষমতার আলোকে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আশা করছি, নগরবাসীর কষ্ট অনেকাংশে লাঘব হবে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরজুড়ে বিশুদ্ধ পানির সংকটের সুযোগে ওয়াসার একশ্রেণীর অসাধু কর্মচারী পানি বাণিজ্য শুরু করেছে। এক গাড়ি পানির দাম ৫শ’ টাকা হলেও এক থেকে দেড় হাজার টাকা করে নেয়া হচ্ছে। পানি না পেয়ে অনেকে বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অনেকেই গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজ সেরে আসছেন নগরীর বিভিন্ন এলাকার স্বজনদের বাসা থেকে।

হাতিরঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন পুকুর এবং লেকেও অনেককে গোসল করতে দেখা গেছে। পানি সংকটের কারণে রাজধানীবাসীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বিভিন্ন গণমাধ্যম, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ঝাড়ছেন।

জানা যায়, ঢাকার অনেক এলাকায় দিনে দু-একবার পানি সরবরাহ করা হলেও তা দুর্গন্ধ ও ময়লাযুক্ত। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ডায়রিয়াসহ নানাবিধ পেটের পীড়ায় ভুগছেন।

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে চাহিদার ৭৮ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে। বাকি ২২ শতাংশ পানি সংগ্রহ করা হয় ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে। আর সেটা করা হয় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী থেকে পানি শোধন করে। নগরীর বেশ কিছু এলাকায় এ পানি সরবরাহ করা হয়।

রাজধানীর সায়েদাবাদ-১, সায়েদাবাদ-২, সায়েদাবাদ-৩ ও চাঁদনীঘাট পানি শোধনাগার প্রকল্প এবং ৭৩০টি গভীর নলকূপ থেকে উত্তোলনকৃত পানি নগরবাসীর মাঝে সরবরাহ করা হয়। এখন শুষ্ক মৌসুমে নদী দুটির পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় দূষণের মাত্রা বেড়েছে। তাই শোধন করার ক্ষমতা কমেছে।

বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে পানি উত্তোলনে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলনও কমেছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এসব কারণেই মূলত নগরীতে পানির জন্য হাহাকার তৈরি হয়েছে।

তবে এ সংকট স্বীকার করতে রাজি নয় ঢাকা ওয়াসা। সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী কামরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা ওয়াসার পানির উৎপাদন সক্ষমতার সমস্যা নেই। চাহিদার তুলনায় বর্তমানে সরবরাহ বেশি। দৈনিক রাজধানীতে চাহিদা ২৩০ কোটি লিটার। কিন্তু উৎপাদন সক্ষমতা ২৪৫ কোটি লিটার। তবে লোডশেডিং, জেনারেটরের অকার্যকারিতা এবং পানির স্তর নেমে গেলে কখনও কখনও অবশ্য উৎপাদন কমে। তবে বর্তমানে উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি। যেসব এলাকায় সংকট সেখানে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা আছে। তাই পানি যাচ্ছে না। সেসব এলাকায় গাড়িতে করে পানি সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় পানির পাইপলাইনের কাজ চলায় এবং অনেকে লাইন ছিদ্র করে পানি নেয়ায় অনেক এলাকার সরবরাহ করা পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আমরা সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি। এছাড়াও অন্য একটি বিষয় হচ্ছে, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি সংগ্রহ করে মোট পানির ২২ ভাগ সরবরাহ করা হয়। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় নদীর পানি অনেক বেশি দূষিত; এ পানি বিশুদ্ধ করতে বেশি কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে এ পানি পানে স্বাস্থ্যগত কোনো কিছু নেই।

সরেজমিন চিত্র : যুগান্তরের ২০ প্রতিনিধি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পানি সংকট; দুর্গন্ধ এবং ময়লাযুক্ত পানি সরবরাহের খবর খুঁজে বের করেছেন। তাদের পাওয়া তথ্যমতে, অভিজাত উত্তরার ১০, ১২ ও ১৩ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সড়কে পানি সংকট রয়েছে ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহ করছে ওয়াসা।

এছাড়া উত্তরার আবদুল্লাহপুর, খালপাড় ও স্লুইসগেট এলাকায় পানি সংকটের পাশাপাশি পানিতে দুর্গন্ধ রয়েছে। গত ৩ বছর ধরে তুরাগের কামারপাড়া, ফুলবাড়ীয়া, ধউর এলাকায় ওয়াসা ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহ করছে। উত্তরখানের বেশিরভাগ এলাকার পানি ভালো; তবে অল্পকিছু বাড়িতে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খিলক্ষেতের বাসিন্দারা নিজেরা চাঁদা দিয়ে ৮০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে পানির পাম্প বসানোর জায়গা কিনে দেন। সেখানে ওয়াসা পাম্প বসিয়েছে। কিন্তু ওই পাম্পের সরবরাহ করা পানিতেও ময়লা।

তেজগাঁওয়ের পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় নতুন পাইপলাইন বসিয়েছে ওয়াসা। কিন্তু পাইপে পানি আসছে না। ফলে ওই এলাকার বাসিন্দাদের ভোগান্তির শেষ নেই। একইচিত্র তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া, আজরতপাড়া, পূর্ব নাখালপাড়া, লিচু বাগান এলাকায়।

রায়ের বাজার বৈশাখী মাঠের আশপাশের এলাকার সরবরাহ করা পানিতে উৎকট দুর্গন্ধ রয়েছে। শ্যামলী, খিলজী রোড, পিসি কালচার সোসাইটিতে সরবরাহ করা পানিতে ময়লা এবং দুর্গন্ধ রয়েছে।

মিরপুরের বেশ কিছু এলাকায় পানি সংকট ও পানিতে ময়লা এবং দুর্গন্ধ পাওয়া গেছে। উত্তর কাফরুল, দারুস সালাম রোড, মিরপুর ১৩-এর সি ব্লকে ১ নম্বর রোড, পশ্চিম বাইশটেকি, পূর্ব বাইশটেকি, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১৬, ৭, ১২ ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন সড়ক এবং অংশ বিশেষ এলাকায় পানির সংকট এবং পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ রয়েছে।

ক্ষুদেবার্তায় মধ্য বাড্ডার আদর্শনগরের মসজিদ গলি এবং ৩ নম্বর রোডে ৯ দিন ধরে পানি না থাকার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী বাসিন্দা ও সাংবাদিক জাভেদ মোস্তফা। মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদী হাউজিং লিমিটেডের ৪ নম্বর রোড এবং চানমিয়া হাউজিং এবং আলী অ্যান্ড নুর রিয়েল এস্টেট এলাকায় দীর্ঘদিন পানি সংকট রয়েছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে জানালেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

সূত্রাপুরের রেবতি মোহন দাস লেন, লক্ষ্মীবাজার ও একরামপুরে পানি সংকটের পাশাপাশি পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ রয়েছে। বাংলামোটর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের গলিতেও তীব্র পানি সংকট রয়েছে।

ওই গলির বিবিএল টাওয়ারের বাসিন্দা রফিউল কবির যুগান্তরকে বলেন, শবেবরাতের দিন আগ থেকে তাদের বাসায় পানি নেই। এজন্য জারের পানি কিনে প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। ওয়াসার গাড়ির পানি আনতে গেলে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ৫০০ টাকা গাড়ি হলেও তাদের অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। সেটা না দিলে তারা পানি দেয় না।

মগবাজারের মধুবাগসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র পানি সংকট বিরাজ করছে। এছাড়া পানিতে রয়েছে উৎকট দুর্গন্ধ। পুরান ঢাকার যাত্রাবাড়ী, মীরহাজীরবাগ, গেণ্ডারিয়া, পোস্তগোলা, নাজিমউদ্দিন রোড, চকবাজার, ইমামগঞ্জ, পাতলাখান লেন, আগামাসি লেন, আরমানিটোলা এবং বংশালের সিদ্দিক বাজার, বিআরটিসি বাস ডিপো, কাপ্তানবাজার, নাজিরাবাজার, পাকিস্তান মাঠ এলাকার পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ রয়েছে।

একই চিত্র চানখাঁরপুল, নাজিমউদ্দিন রোড, সাতরোজা, হোসনি দালাল রোড এলাকায়। মালিবাগ, বেইলি রোড, শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দাদের পানি পেতে খুবই কষ্ট করতে হচ্ছে। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থেকে মানুষ পানি সংগ্রহ করছেন। ডেমরার মাতুয়াইল, মোমেন বাগ, ডগাইর এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৬৬, ৬৫ ও ৬৬ নম্বর সড়কে তীব্র পানি সংকট বিরাজ করছে।

সম্পর্কিত পোস্ট

Add Comment

অন্যান্য সংবাদ