মিটফোর্ড হাসপাতাল: ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে অসহায় রোগী

Post Iamge

Advertise

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ৪র্থ শ্রেণীর আয়া, ওয়ার্ডবয়দের দৌরাত্ম্যে অসহায় হয়ে পড়েছে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনরা। প্রতি শিফটে ডিউটিতে আসা স্টাফরা রোগীদের নিকট অর্থ দাবি করছে।

চাহিদামতো অর্থ না দিলেই রোগী ও স্বজনদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয়। এমনকি মারধরের ঘটনাও ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ করা কোম্পানি প্রতিমাসে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বেতন থেকে ২ হাজার টাকা করে কেটে নেয়। এ টাকা রোগীদের কাছ থেকে আদায় করতে তারা বকশিশ নেন বলে জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ওয়ার্ডবয় ও আয়া যুগান্তরকে বলেন, তাদের নিয়োগ করা কোম্পানি ধলেশ্বর সিকিউরিটি প্রতিমাসে বেতন থেকে ২ হাজার টাকা করে কেটে নেয়।

বেতন বহিতে রেভিনিউ স্ট্যাম্পের ওপর সাড়ে ১৫ হাজার টাকার স্বাক্ষর নিয়ে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা ক্যাশ প্রদান করেন তারা। তাছাড়া ওয়ার্ড মাস্টারদের ৫শ’ টাকা করে দিতে হয়। এজন্য রোগীর কাছ থেকে দু’চারশ’ টাকা বকশিশ নেন বলে জানান তারা।

জানা গেছে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে আয়া, ওয়ার্ডবয় ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী সংকট দেখা দেয়ায় ২০১৮ সালে সরকার আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে ২০০ জন নতুন কর্মী ওইসব পদে নিয়োগ দিতে দোলেশ্বর সিকিউরিটি নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়।

শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক পক্ষ ও হাসপাতালের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারী মিলে একটি সিন্ডিকেট গঠন করে অর্থের বিনিময়ে লোকবল নিয়োগ দিতে শুরু করে। প্রতি নিয়োগ প্রত্যাশীর কাছ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে নেয় ওই চক্র।

এ প্রক্রিয়াটি পুরো সমন্বয় করেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রায়ান বঙ্কিম হালদারের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সমিতির সভাপতি মুজাফ্ফর হোসেন বাবুল। বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে চক্রটি এখনও থেমে নেই।

প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন নিজ রুমে ডেকে নিয়ে কর্মচারীদের বেতন বহিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করছেন। কোনো কর্মচারী প্রতিবাদ করলেই তাকে ছাঁটাইসহ মাসিক বেতন বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি নানাভাবে হুমকি দেন কর্মচারী সমিতির সভাপতি বাবুল ও তার লোকজন।

হাসপাতালে প্রবেশ করতেই জরুরি বিভাগের সামনে কয়েকজন রোগীর জটলায় চিৎকার চেঁচামেচি। সড়ক দুর্ঘটনার গুরুতর আহত একজন রোগীকে গাড়ি থেকে নামানোর জন্য স্টেচার (রোগী স্থানান্তরের জন্য চাকা বিশিষ্ট বিছানা) পাওয়া যাচ্ছে না।

দূর থেকে দেখা গেল, হাসপাতালের আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া একজন কর্মচারী স্টেচার ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তিনি ৩শ’ টাকা না দিলে স্টেচারে রোগী তুলতে দেবেন না বলে জানান রোগীর স্বজনদের। তখন বাধ্য হয়েই রোগীর স্বজনরা ২শ’ টাকা দিয়ে তার কাছ থেকে স্টেচার নিয়ে রোগীকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে যান।

হাসপাতালটির মেইন বিল্ডিংটির ৩য় তলায় দেখা যায়, ওয়ার্ড থেকে অপারেশন থিয়েটারে একজন রোগীকে হুইল চেয়ারে করে আনার জন্য আয়া ৫শ’ টাকা দাবি করছে। রোগীর স্বজন ৩শ’ টাকা দেয়ায় অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে করতে ওই আয়া চলে যান।

পথিমধ্যে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে টাকা দাবির বিষয়ে ওই আয়ার কাছ জানতে চাওয়া হলে হামিদা (ছদ্মনাম) এ আয়া বলেন, প্রতিদিন এ হুইল চেয়ারটির জন্য ওয়ার্ড মাস্টারকে ৩শ’ টাকা দিতে হয়। এজন্য আমরা রোগীর কাছ থেকে টাকা আদায় করছি বলে জানান তিনি।

আমির হোসেন, আসলাম হোসেন, ফরিদ আহাম্মদসহ কয়েকজন রোগীর স্বজন যুগান্তরকে বলেন, এ হাসপাতালটিতে রোগীদের কদমে কদমে টাকা গুণতে হচ্ছে। একদিকে ডাক্তার বিভিন্ন টেস্টের নামে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

অন্যদিকে আয়া ও স্টাফরা বকশিশের নামে শত শত টাকা আদায় করছে। তাদের দাবি করা টাকা না দিলে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে। প্রতিবাদ করলেই সংঘবদ্ধ কর্মচারীরা মারতে উদ্যত হচ্ছে বলে জানান তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আউট সোর্সিং পদ্ধতিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারী যুগান্তরকে বলেন, লাখ লাখ টাকা খরচ করে চাকরি নিয়েছি।

অনেকে ধার করে টাকা দিয়েছে। উপরন্তু বেতন থেকে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা কেটে নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এসব কারণে রোগীদের কাছ থেকে দুই একশ’ টাকা বকশিশ দাবি করা হয়।

মিটফোর্ড হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার আবদুর রব কবিরাজ ও ইসহাক যুগান্তরকে বলেন, ডিউটি বণ্টনের জন্য কোনো কর্মচারীর কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয় না। তারাও কোনো টাকা নেন না বলে জানান।

লোকবল সরবরাহকারী আউট সোর্সিং প্রতিষ্ঠান ধলেশ্বর সিকিউরিটির মালিক আতিকুল ইসলামের কাছে বক্তব্য জানতে বার বার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতির সভাপতি মুজাফফর হোসেন বাবুল যুগান্তরকে বলেন, কোম্পানি কাজটি আনতে অনেক টাকা খরচ করেছে। তাছাড়া প্রতি মাসে ঊর্ধ্বতন মহলকে খুশি করতে হয়, তাই কর্মচারীদের কাছ থেকে কিছু টাকা সংগ্রহ করে খরচ পুষিয়ে নেয়া হয়।

হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমার সামনে প্রতিজন কর্মচারী বেতন বহিতে স্বাক্ষর করে নিজ বেতন বুঝে নিচ্ছে। এখানে দুই হাজার টাকা করে কেটে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কর্মচারীরা দেখেশুনেই স্বাক্ষর করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ব্রায়ান বঙ্কিম হালদার যুগান্তরকে বলেন, স্পেশাল আয়া ও আউট সোর্সিং লোকবল ছাড়া হাসপাতাল চালানো সম্ভব নয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে রোগীদের নিকট থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ অনেক পুরনো।

এসব অভিযোগের কারণে আমরা অনেকের ডিউটি অফ করে দিয়েছি। এছাড়া আউট সোর্সিং কর্মচারীদের বেতন থেকে নিয়ম অনুযায়ী ভ্যাট ও ট্যাক্স এর টাকা কেটে রাখা হয়। এছাড়া কোনো অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে জাকির ও বাবুলের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

সম্পর্কিত পোস্ট

Add Comment

অন্যান্য সংবাদ