নতুন দল গঠনের ঘোষণা সংস্কারপন্থীদের

Post Iamge

Advertise

জামায়াতে ইসলামীর সংস্কারপন্থী নেতারা আগামী তিন মাসের মধ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। যার প্রথম ধাপ হিসেবে শনিবার ‘জন-আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ স্লোগানের একটি রাজনৈতিক মঞ্চের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর ভাঙন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের সমন্বয়কের দায়িত্বে আছেন বহিষ্কৃত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু। নতুন রাজনৈতিক দলের নাম, কাঠামো, কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে ৫টি পৃথক কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এদিকে এ উদ্যোগে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ও ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের থাকা নিয়ে নানা মহলে গুঞ্জন চলছে।

রাজধানীর একটি হোটেলে শনিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের কথা জানান মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতিও ছিলেন। এছাড়া চট্টগ্রাম কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরেরও সভাপতি ছিলেন।

 

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালনকারী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ১৫ ফেব্রুয়ারি দলটি থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি জামায়াত বিলুপ্ত করে একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চেয়ে নতুন দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখনই রাজ্জাকের মতো মতপ্রকাশের জন্য দল থেকে বহিষ্কৃত হন মঞ্জু। তারপর তিনি বিকল্প দল গঠনের উদ্যোগ নেন, যা শনিবার প্রকাশ্যে আনলেন। সংবাদ সম্মেলনে মঞ্জু দাবি করেন, নতুন দল গঠনের উদ্যোগের সঙ্গে বিদেশে থাকা ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে আমরা দেশে-বিদেশে অনেকের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছি। তিনি বলেন, আমরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করব। আলোচনা, পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমরা সংগঠনের নাম, কাঠামো, কর্মপদ্ধতি ঠিক করব। আজ থেকে আমাদের কাজ শুরু হল।

রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে মঞ্জু বলেন, পাঁচটি পৃথক কমিটি করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- রাজনৈতিক প্রস্তাবনার খসড়া প্রণয়ন কমিটি; জনসংযোগ ও অন্তর্ভুক্তি তত্ত্বাবধায়ন কমিটি; গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক কমিটি; অর্থ সংগ্রহ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা কমিটি; সাংগঠনিক কাঠামো প্রস্তাবনা, কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা কমিটি। এসব কমিটি তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। আপাতত এ উদ্যোগে সমন্বয়কের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে নতুন দল নিয়ে সক্রিয় হওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

নতুন দলটি কোনো ধর্মভিত্তিক দল হবে না দাবি করে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আমরা যে রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি, তা হবে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য। জামায়াতসহ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের নতুন দলের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এ উদ্যোগের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক আছে কি না জানতে চাইলে মঞ্জু বলেন, অনেকে এ উদ্যোগের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশ থাকার সন্দেহ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। কারও মদদ বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে আমরা আসিনি। অনেক বাধাবিপত্তি এসেছিল আমাদের ওপর, সামনেও আসবে। তারপরও আমরা এগিয়ে যাব। বাংলাদেশ এখন ‘অধিকারহীন, অনিরাপদ ও স্বৈরতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

নির্দিষ্ট ১৯টি বিষয়ে একমত হয়ে সবাই এই উদ্যোগে শামিল হয়েছেন জানিয়ে মঞ্জু জানান, তারা নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করছেন না, জনগণের আকাক্সক্ষাভিত্তিক দল গঠন করবেন। এ রাজনৈতিক দল হবে ইতিবাচক বাংলাদেশ গড়ার নতুন কার্যক্রম।

জামায়াতকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অনীহা প্রকাশ করলেও তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী একমাত্র দল না হলেও পরবর্তী সময়ে জামায়াতের ভূমিকা নিয়েই বেশি প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার দায় স্বীকারের আহ্বান জামায়াত নেতৃত্ব অগ্রাহ্য করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই রাজনৈতিক অবস্থানের বোঝা একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের বহন করা উচিত নয় বলে আমরা বিশ্বাস করি।

যুদ্ধাপরাধের চলমান বিচার প্রশ্নে মঞ্জু বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এ বিচার নিষ্পত্তির দাবি জানাচ্ছি আমরা।

জামায়াতের ভেতর সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করছেন কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে মঞ্জু বলেন, অতীতে যেখানে ভূমিকা রাখতে চেয়েছিলাম সেখানে যখন নেই, সেই বিষয়ে কথা না বলি। আমরা নতুন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি। অতীতের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা কোনো তত্ত্বের কথা বলব না, অধিকারের কথা বলব।

নতুন দল গড়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন, তাহলে জামায়াত ভেঙে যাচ্ছে- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা ভাঙা-গড়ায় বিশ্বাসী নই।

মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ঔপনিবেশিক শাসনামলেও দু’বার গভীর সংকটকালে জাতিকে নতুন পথ দেখিয়েছিল মুসলিম লীগ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ। আর স্বাধীন বাংলাদেশে তেমন এক ক্রান্তিকালে হাল ধরেছিলেন জিয়াউর রহমান। প্রায় চার যুগ পর আজ আবার আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি তেমন আরেক বাঁক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে। একাত্তরে যে আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়ার দায়িত্ববোধ করছি আমরা।

এদিকে জামায়াতে ইসলামী সূত্রে জানা গেছে, সংস্কারপন্থীদের নতুন দল গঠন নিয়ে এমনিতেই চাপে জামায়াতের মূল নেতৃত্ব। এখন নতুন দলে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের থাকা তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে। কারণ হিসেবে জামায়াতের নেতারা মনে করছেন, তাজুল ইসলাম ব্যারিস্টার রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। রাজ্জাক পদত্যাগ করলেও তৃণমূল জামায়াতের তরুণদের বড় অংশই তার সমর্থক। ফলে তার ঘনিষ্ঠজনরা সংস্কারপন্থীদের নতুন দলে থাকা মানে এই প্রক্রিয়ায় ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সমর্থন আছে।

অবশ্য আবদুর রাজ্জাক এ ধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না থাকার কথা বলেছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি নিজে কোনো দল করছি না। কিন্তু বাংলাদেশে একটি সুস্থ রাজনীতির ধারা গড়ে উঠুক, এটা আমি চাই। কেউ যদি এমন রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন, নাগরিক হিসেবে তাদের প্রতি আমার সমর্থন থাকবে। তবে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই।

সংস্কারপন্থীদের নতুন দল গঠন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এমাজউদ্দীন আহমদ যুগান্তরকে বলেন, নতুন দলে ভালো ও সৎ লোকজন থাকবে, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে চিন্তাভাবনা ধারণ করবে- এটি আশা করি আমরা। তবে তাদেরকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করবে, তা ভাবার বিষয়। তাদের কাজকর্মের মধ্য দিয়ে সবকিছু প্রমাণ করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। মঞ্জুর উদ্যোগের সঙ্গে শামিল হওয়ার কথা জানিয়ে তাজুল দাবি করেন, আমি আগে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। পেশাগত কারণে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছি।

সংবাদ সম্মেলনে মঞ্জুর পাশে তাজুল ছাড়াও ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হক, গোলাম ফারুক, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা নূর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, মাওলানা আবদুল কাদের, নাজমুল হুদা অপু, মো. সালাউদ্দিন, ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, গৌতম দাশ, সুকৃতি কুমার মণ্ডল।

সম্পর্কিত পোস্ট

Add Comment

অন্যান্য সংবাদ

নিউজলেটার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন

আপনার ইনবক্সে সেরা খবর পেতে সাবস্ক্রাইব করুন । আমরা আপনাকে স্প্যাম করব না এবং আমরা আপনার গোপনীয়তাকে সম্মান করি।