চকের ইফতারে ঐতিহ্যের সঙ্গে রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

Post Iamge

Advertise

রমজান সংযমের মাস হলেও ঐতিহ্যবাহী ইফতারের কদর বহু আগে থেকেই। সারা দিন রোজা রাখার পর মুখরোচক ইফতারের খোঁজে নেমে পড়েন রোজাদাররা। তবে মুখরোচক মানেই কিন্তু ভালো খাবার নয়।

তাই ইফতার বাছাই করার আগে সচেতন হতে বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা। তবে ভোজনরসিকদের কাছে ইফতার মানেই চকবাজারের ইফতার। চকে যেসব খাবার পাওয়া যায় সেগুলো ঐতিহ্যবাহী হলেও মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। খোলা আকাশের নিচে ঢাকনাবিহীন ঘর্মাক্ত শরীরে ইফতার বিক্রি করায় এগুলোর খাদ্যমান নিয়ে প্রশ্ন থাকার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও রয়েছে অনেক।

রোজার প্রথম দিন মঙ্গলবার দুপুরে চকবাজারে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ দোকানিই সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বসে আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বেশির ভাগ খাবারই আগের দিন তৈরি করা। কিছু খাবার সকালের। খাবারের পসরা দেখে কোনো কিছুই বোঝার উপায় নেই। দেদার চলছে হাঁকডাক। বেশির ভাগ খাবারই খোলা। প্রচণ্ড খরমে খালি হাতে মাখামাখি।

চকের ইফতার নিয়ে জানতে চাইলে শমরিতা হাসপাতালের কনসালটেন্ট নিউট্রিশনিস্ট খালেদ উম্মেদ নাহার হুমায়রা বলেন, চকবাজারের খাবারে ব্যবহার করা হয় কৃত্তিম রঙ, নানা ধরনের অস্বাস্থ্যকর মসলা।

খোলা পরিবেশে বিক্রি করায় এসব খাবারে ছড়িয়ে থাকে নানা ধরনের ধুলাবালি ও রোগজীবাণু। এমনকি একই তেল ব্যবহার করা হয় বারবার। এ কারণে এসব খাবার এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্পন্ন হয়, যা ক্যান্সরের ঝুঁকি বাড়ায়। বিভিন্ন ধরনের রঙিন শরবত ও কোমল পানীয় কিডনিতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবারে বাড়ে হৃদরোগের ঝুঁকি।

অন্যবারের মতো এবারও চকের ইফতার সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়, খাশি ও গরুর সূতি কাবাব, শাহী জিলাপি, খাসির লেগ রোস্ট, আস্ত মুরগি, দইবড়া, বাদামের শরবত, গুগনি, টানা পরোটা, কিমা পরোটাসহ প্রায় শতাধিক আইটেম।

ঐতিহ্যবাহী এসব খাবার একসময় তৈরি ও পরিবেশন করতেন বিখ্যাত সব বাবুর্চি। কিন্তু ক্রমেই বাজারটি এখন মৌসুমী ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চকবাজারে হাতেগোনা কয়েকজন ইফতার সামগ্রী বিক্রি করছেন যারা বংশপরিক্রমায় এখানে ব্যবসা করে আসছেন। এরা বছরের অন্য সময়ও বিভিন্ন ধরনের খাবারই বিক্রি করেন চকে। বাকিরা সবাই মৌসুমী ব্যবসায়ী।

এ বছর খাবারের দামও চড়া। বড় বাপের পোলা খায় (প্রায় ৩০ পদের খাবার ও মসলার যোগে তৈরি) দাম রাখা হচ্ছে ৫০০ টাকা কেজি, খাসির লেগ রোস্ট ৫০০ টাকা, সুতি কাবাব গরু কেজিপ্রতি ৯০০ টাকা ও খাসির সুতি কাবাব ১১০০ টাকা, ফালুদা, লাচ্ছি, শরবত পাওয়া যাচ্ছে ৩০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে।

এ ছাড়াও টানা পরোটা, কিমা পরোটা, আলুর চপ, ডিম চপ, সাসলিক পাওয়া যাচ্ছে ৫ থেকে ৬০ টাকায়, দই বড় ৫ পিস ১০০ টাকা, জিলাপি কেজি প্রতি ১৪০ টাকা, হালিম ১০০ থেকে ৮০০ টাকায়।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, চকের সুতি কাবাব এখনও তার মান ধরে রেখেছে। এ ছাড়া প্রায় অন্য সব খাবারেরই মান কম বেশি পড়ে গেছে। রোজার সময় আগে চক থেকে নিয়মিত ইফতার সামগ্রী কেনা হলেও এখন কমই কেনা হয়। বাজার ঘুরে দেখা যায়, খাবার বিক্রির সময় দু’একজন ছাড়া বেশির ভাগই গ্লাভস ব্যবহার করেন না। তারা নিজেদের ঘর্মাক্ত হাত দিয়ে পরিবেশনের কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেকে টাকা দেয়া নেয়া, খাবার পরিবেশন এক হাতেই সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছেন।

চকের ইফতার কতটা স্বাস্থ্যসম্মত জানতে চাইলে নিউট্রিশনিস্ট খালেদ উম্মেদ নাহার হুমায়রা বলেন, চকবাজারের ইফতারি না খেলেই নয়, এমন একটি বিষয় রাজধানীবাসীর মনে স্থান করে নিয়েছে। এবার রোজায় আমাদের প্রায় ১৪-১৫ ঘণ্টা পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। ফলে আমাদের মাংসপেশি সংকুচিত হয়ে পড়ে। শরীরে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, জিঙ্ক খনিজের ইত্যাদির ঘাটতি দেখা দেয়। তাই ইফতারিতে এমন খাবার খাওয়া উচিত যা সহজে শরীর গ্রহণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে খেজুর একটি আদর্শ খাবার। খেজুরে রয়েছে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, চিনি ও লবণ। যা সারা দিনের ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করে। ইফতারের সময় পানীয় হিসেবে লাচ্ছি ও চিনি ছাড়া লেবুর শরবত খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া ডাবের পানি আদর্শ পানীয়। হুমায়রা বলেন, ইফতারিতে তৈলাক্ত খাবার পরিহার করে স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টিকর খাবারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

এখন মৌসুমি ফল হিসেবে তরমুজ, আনারস খাওয়া যেতে পারে। এ ফলগুলোতে পর্যাপ্ত খনিজ রয়েছে। ভারি খাবারের মধ্যে দই-চিড়া, কলা-মুড়ি এবং ওটস আদর্শ। যারা আরও একটু ভারি এবং মুখরোচক খাবার খেতে চান তারা স্বল্প তেলে নুডুলস তৈরি করে খেতে পারেন। তিনি বলেন, সারা দিন রোজা রাখার পর মুখরোচক স্বাস্থ্যহানিকর খাবার না খেয়ে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারের প্রতি সবার গুরুত্ব দেয়া উচিত।

খাদ্যে ভেজাল মেশালে ঈদ কটাবে জেলে -সাঈদ খোকন : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, ইফতার সামগ্রীসহ যে কোনো খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশালে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাউকে রক্ষা করা হবে না।

মোটা অঙ্কের অর্থ জরিমানাসহ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। ঈদ কাটাতে হবে জেলখানায়। মঙ্গলবার বিকালে চকবাজারে ইফতার সামগ্রী বিক্রি পরিদর্শন করতে গিয়ে এসব কথা বলেন মেয়র। তবে মেয়রের চকবাজার ছাড়ার পরপরই দোকানিরা তাদের খাবারের ওপর থেকে পলিথিন সরিয়ে ফেলেন। পরে প্রায় সবাইকে ঘর্মাক্ত শরীরে ইফতার বিক্রি করতে দেখা যায়।

মেয়র বলেন, ইফতার ও সেহরির খাবারের মান নিয়ন্ত্রণে বাজারে পাঁচটি মনিটরিং টিম কাজ করছে। এই টিমে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ছাড়াও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) প্রতিনিধিরা থাকবেন। তারা নিশ্চিত করবেন যাতে কেউ ভেজাল পচা-বাসি খাবার বিক্রি করতে না পারে।

দুই প্রতিষ্ঠানকে লক্ষাধিক টাকা জরিমানা : চকবাজারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরির অভিযোগে দুই প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালত। পবিত্র রমজান মাসে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল বন্ধে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার প্রস্তুত প্রতিরোধে রাজধানীজুড়ে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ।

এর অংশ হিসেবে রমজানের প্রথম দিন মঙ্গলবার চকবাজারে এ অভিযান চালানো হয়। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান জানান, দুপুরে ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে ডিবি ও ক্রাইম বিভাগের সমন্বয়ে একটি দল চকবাজার এলাকায় খাদ্যদ্রব্যে ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে।

এ সময় অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন করার অভিযোগে চকবাজারের চম্পাতলীর সাইফ এডিবল ফুড প্যাকেজিংয়ের মালিক শরীফ আবদুর রউফকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই অপরাধে চক সার্কুলার রোডের অরজিনাল বোম্বে সুইটস অ্যান্ড চানাচুরের ম্যানেজার মো. রাসেলকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

সম্পর্কিত পোস্ট

Add Comment

অন্যান্য সংবাদ